Breaking News
মাৎস্য চাষ

(কৃষি শিক্ষা-২য়) HSC : মাৎস্য চাষ এর সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর

মাৎস্য চাষ হচ্ছে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী অর্থাৎ এইচএসসি’র কৃষি শিক্ষা -২য় পত্রের প্রথম অধ্যায়। মাৎস্য চাষ অধ্যায় থেকে বাছাইকৃত সেরা ৫টি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

মাৎস্য চাষ এর সৃজনশীল

সৃজনশীল প্রশ্ন ১ : বাগমারা উপজেলায় আয়োজিত মৎস্য সপ্তাহ উদযাপন অনুষ্ঠানে মৎস্য কর্মকর্তা মৎস্য চাষিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয় যেমন-খাল, বিল, নদী, নালা, হাওর-বাঁওড় হতে মৎস্য সম্পদ হ্রাসের কারণ আলোচনা করেন। এরপর তিনি মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে উপযুক্ত পরামর্শ প্রদান করেন।

ক. নিউসটন কী?
খ. পিএল টেকসইকরণ বলতে কী বোঝায়?
গ. উল্লিখিত সম্পদ হ্রাসে মৎস্য কর্মকর্তার বর্ণিত কারণসমূহ ব্যাখ্যা করো।
ঘ. মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ বিশ্লেষণ করো।

১ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. নিউসটন হলো পানির উপরিভাগে ঝুলে থেকে বা ভাসমান অবস্থায় সাঁতাররত বা বিশ্রামকারী জীব।

খ. গলদা চিংড়ির পোনাকে পিএল বা Post Larvae বলা হয়।
চিংড়ির পোনা পুকুরে ছাড়ার পূর্বে জলজ পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর জন্য যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাকে পিএল টেকসইকরণ বলে।
এ পদ্ধতিতে পোনার ব্যাগ বা পাতিলটি পুকুরে কিছুক্ষণ ভাসিয়ে রাখতে হয়। ব্যাগের ভিতরের পানি এবং পুকুরের পানি অদল- বদল করতে হয়। এভাবে দুই পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততায় সমতা আনতে হয়। পাড়ের কাছাকাছি সকালে বা বিকেলে পোনা ছাড়তে হয়।

গ. মৎস্য কর্মকর্তা বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয় হতে দিন দিন মাছ কমে যাওয়ার কারণ চাষিদের বলেন।
মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী মাছ কমে যাওয়ার কারণ হলো—
মানুষ জলাশয় হতে নির্বিচারে মৎস্য শিকার করায় জলাশয়গুলো মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ছে। দেশের অধিকাংশ নদ-নদী পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিল, হাওর-বাঁওড় ও পরিত্যক্ত ডোবাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে মাছ চাষের জায়গা হ্রাস পাচ্ছে। উন্মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য আহরণ সংক্রান্ত আইন কার্যকর করার শৈথিল্যের কারণে নিষিদ্ধ মৌসুমেও মাছ শিকার করা হয়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবে মুক্ত জলাশয়ের মাছে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অনেক সময় চিংড়ি মাছের পোনা সংগ্রহ করে বাছাই করার সময় অন্যান্য মাছের পোনা অবাধে মেরে ফেলা হয়। ব্যাপক হারে ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাছেরা তাদের বংশ বৃদ্ধির সুযোগ পায় না। ফলে মাছের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মাছ রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে পানি সেচের কারণে বিভিন্ন জলাশয়গুলো মাছ চাষের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। জনসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিজমি সম্প্রসারিত হচ্ছে, ফলে মৎস্যক্ষেত্র ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে মৎস্য সম্পদ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।

ঘ. মৎস্য কর্মকর্তা চাষিদের মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের পরামর্শ দিলেন।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রতিনিয়ত জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আবার শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানার বর্জ্য নদীর পানিতে পড়ে দূষণ সৃষ্টি করায় মৎস্য হ্রাস পাচ্ছে। মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে তাই কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
জলাশয় যাতে ভরাট না হয় সে জন্য ড্রেজার দ্বারা মাটি খনন করা যাবেনা। নির্বিচারে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পানি সেচ ও বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। নিষিদ্ধ কারেন্টজাল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ফসলের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অতিমাত্রায় মাছ আহরণ বন্ধ করতে হবে। যথাসম্ভব মৎস্য চাষের জলাশয়ের আয়তন বাড়াতে হবে। মৎস্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চাষিদের ঋণের ব্যবস্থার মাধ্যমে মাছ চাষে উৎসাহিত করতে হবে। জলাশয়ে উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অক্সিজেনের স্বল্পতা দূর করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জলাশয়ে রাক্ষুসে মাছ ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী দূরীকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী মাছ চাষ করতে হবে। জলাশয়ের বিভিন্ন স্থানকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অতএব বলা যায়, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শসমূহ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।

মাৎস্য চাষ এর সৃজনশীল

সৃজনশীল প্রশ্ন ২ : মিঠুন ২০০ শতক আয়তনের জমিতে ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেন। মৎস্য কর্মকর্তা তাকে জানান “ধানক্ষেতে খাদ্য ব্যবস্থাপনার উপর গলদা চিংড়ির ফলন নির্ভরশীল।” মিঠুন মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ মোতাবেক ধানক্ষেতে গলদা চিংড়ি চাষ করে সফলতা লাভের চেষ্টা করেন।

ক. মাছ প্রতিদিনের খাদ্যের কত ভাগ আমিষের যোগান দেয়?
খ. কোন উপাদানগুলোর মাধ্যমে নিরাপদভাবে মাছ সংরক্ষণ করা হয় তা লেখো।
গ. মৎস্য কর্মকর্তার উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. মিঠুনের কার্যক্রমটির সুবিধা-অসুবিধা বিশ্লেষণ করো।

২ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. মাছ প্রতিদিনের খাদ্যের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ আমিষের যোগান দেয়।

খ. নিরাপদ মাছ সংরক্ষণের প্রধান ৪টি উপাদান রয়েছে। যেমন-
১. মাছ ধরার পর পরিবেশ রক্ষা : মাছ ধরার পরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখা যাতে মাছের ভেতরে এনজাইমের ক্রিয়া, জীবাণুর ক্রিয়া ও রাসায়নিক বিক্রিয়া না হয় ।
২. মাছ প্রক্রিয়াজাত করা : যেমন- মাছের আর্দ্রতা কমানো ও বরফ দেয়া।
৩. বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ না দেওয়া।
৪. মাছ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা।

গ. মিঠুন ২০০ শতক আয়তনের জমিতে ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে মৎস্য কর্মকর্তা তাকে খাদ্য ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্বারোপ করতে বলেন।
ধানক্ষেতে গলদা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত সম্পূরক খাদ্য হিসেবে ১৩ হারে চালের মিহি কুঁড়া ও গোবর সার প্রয়োগ করতে হয়। এভাবে হেক্টর প্রতি ১০ কেজি পরিমাণ খাদ্য প্রতি ৭ দিন পর পর নালার বিভিন্ন স্থানে দিতে হয়। তাই মিঠুনের জমিতে ৮.১০ কেজি খাদ্য প্রতিদিন দিতে হয়। পোনা মজুদের ১ মাস পর চালের কুঁড়া বা গমের ভুসি ও গুঁড়া খৈল ১ : ১ হারে একত্রে মিশিয়ে ১/২ দিন পরপর নালায় প্রয়োগ করতে হয়। | চিংড়ির মোট ওজনের ৩-৫% হারে এই খাদ্য একত্রে মিশিয়ে বল আকারে শেষ বিকেলে ধানক্ষেতের নির্দিষ্ট কতকগুলো স্থানে দিতে হয়। পুকুরে বা ঘেরে গলদা চাষের মত ধানক্ষেতে গলদা চাষের বেলায়ও শামুক বা ঝিনুকের মাংস বা নিম্নমানের গম বা চাল সিদ্ধ করে খাদ্য হিসেবে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায় ।
ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পরিমাণমতো খাদ্য সঠিক নিয়মে ধানক্ষেতে প্রয়োগ করতে হবে।

ঘ. মিঠুন তার জমিতে ধানের সাথে একই সময়ে গলদা চিংড়ি চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ ধরনের সমন্বিত চাষের কিছু সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে।
ধানের সাথে চিংড়ি চাষ করলে চিংড়ির জন্য তেমন বাড়তি পুঁজির প্রয়োজন হয় না। এই চাষ পদ্ধতিতে একই জমি থেকে ধানের সাথে অতিরিক্ত ফসল হিসেবে চিংড়ি পাওয়া যায়। ধানক্ষেতে চিংড়ির বিচরণের জন্য আগাছা কম জন্মে, অনিষ্টকারী পোকামাকড় চিংড়ি খেয়ে ফেলে, ফলে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। চিংড়ির মল ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ ধানক্ষেতে।
সার হিসেবে কাজ করে। ধানক্ষেতে চিংড়ির চাষের ফলে ধানের ফলন ১০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পরিবারের সুষম পুষ্টি নিশ্চিত হয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ধানক্ষেতে চিংড়ি চাষের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধারও সৃষ্টি হয়। অনেকদিন বৃষ্টি না হলে ক্ষেতের পানি শুকিয়ে চিংড়ি চাষে অসুবিধার সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় পানির গভীরতা চিংড়ি চাষের জন্য অনুকূল হয় না। বেশি বৃষ্টি বা বন্যা হলে চিংড়ি পানির সাথে ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ধানক্ষেতে রাসায়নিক সার, বিশেষ করে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় যা চিংড়ির জন্য ক্ষতিকর। আকস্মিক ভাইরাসের আক্রমণেও অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
উপরের আলোচনা হতে দেখা যায়, ধানক্ষেতে গলদা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও আছে যা বিবেচনায় নিয়ে চাষের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

মাৎস্য চাষ এর সৃজনশীল

সৃজনশীল প্রশ্ন ৩ : লাবু কৃষি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা “কৃষি কথা”-র সদস্য। এই পত্রিকার একটি প্রতিবেদন পড়ে সে জানতে পারে যে, বর্ষা মৌসুমে বিশেষ এক ধরনের মাঠ ফসল ও মাছের সমন্বিত চাষ করা যায়। যেসব জমিতে পানির স্থায়িত্ব ৩-৪ মাস এবং পানির গভীরতা ১০-১২ সেমি হয়, সেসব জমিতে এই ফসল ও মাছের সমন্বিত চাষ করা যায়। সে মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে জমি তৈরি ও ব্যবস্থাপনার পরামর্শ গ্রহণ করে বেশ লাভবান হয়।

ক. প্লাংকটন কী?
খ. মাছের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
গ. লাবুর সমন্বিত চাষ পদ্ধতিটি কী? ব্যাখ্যা করো ।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত “সমন্বিত চাষ পদ্ধতিটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক” মূল্যায়ন করো।

৩ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. প্লাংকটন হলো পানিতে মুক্তভাবে ভাসমান আণুবীক্ষণিক জীব যা মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

খ. খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করার পাশাপাশি মাছ আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
শিল্পক্ষেত্রে, সার হিসেবে, হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে মাছের নানা ব্যবহার আছে বলে কর্মসংস্থানের একটি ভালো উপায় হলো মাছের চাষ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০১৭ এর মতে, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প উৎপাদিত মাছের বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১% মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে দেশের আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৬৫%। তাই বলা যায়, মাছ চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

গ. লাবুর সমন্বিত চাষ পদ্ধতিটি হলো ধানের সাথে গলদা চিংড়ির চাষ। একই জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসল উৎপাদন করাকে সমন্বিত চাষ বলে।
ধানের সাথে চিংড়ি চাষ পদ্ধতি নিম্নে আলোচনা করা হলো-
যে জমিতে বছরে ৩-৪ মাস সময় এবং ১০-২০ সেমি গভীরতায় পানি আটকে রাখা যাবে এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। জমির আইল শক্ত, মজবুত এবং উঁচু করে তৈরি করতে হবে। পানির গভীরতা সমান রাখার জন্য জমির সকল স্থানে চাষ দিয়ে সমতল রাখতে হবে। জমিতে ভালোভাবে চাষ দেয়ার পর প্রচলিত নিয়মে রাসায়নিক সার ও গোবর সার মিশিয়ে জমি তৈরি করতে হবে জমির ঢাল অনুযায়ী ক্ষেতের ভিতরে আড়াআড়িভাবে কয়েকটি নালা খনন করতে হবে। প্রতিটি নালা ৫০-৬০ সেমি গভীর এবং ৬০-১০০ সেমি প্রশস্ত হতে হবে। নালার মাথায় কিংবা সংযোগস্থানে নালার চেয়ে গভীর ও প্রশষ করে গর্ত খনন করতে হবে যার গভীরতা হবে ১ মিটার। ধানের চারা সারিবদ্ধভাবে রোপন করতে হবে। ধানের চারা রোপনের ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেমি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১৫-২০ সেমি রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ধানের চারা রোপনের ২০-২৫ দিন পর চিংড়ির পোনা ছাড়তে হয়। জমিতে পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময় হলো সকাল বা বিকাল বেলা। ধান ক্ষেতে চিংড়ি চাষে মোট সময় হলো ৩-৪ মাস। তাই পোনা মজুদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫ সেমি দীর্ঘ পোনা মজুদ করা উচিত। ধান ক্ষেতে চিংড়ি চাষে সম্পূরক খাদ্য হিসেবে চালের কুঁড়া ও গোবর ১:৩ অনুপাতে মিশিয়ে বলের আকারে শতাংশ প্রতি ৪০-৪৫ গ্রাম করে প্রতি ৭ দিন অন্তর অন্তর গর্তে দিতে হবে। ১ মাস পর চিংড়ির বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে মোট ওজনের ৩-৫% হারে খৈল ও চালের কুঁড়া ১ঃ ১ অনুপাতে মিশিয়ে ১ দিন পরপর নালায় ও গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। চিংড়ি ছাড়ার পর জমিতে সব সময়ই পানি রাখতে হবে। ধান পাকা শুরু হলে ক্ষেতের পানি কমাতে হবে এবং ধান কাটার পরে গর্তের মধ্য থেকে চিংড়ি ধরতে হবে। এক্ষেত্রে চিংড়ির গড় উৎপাদন হবে শতক প্রতি ১.৫-২.০ কেজি। পরিশেষে বলা যায়, লাবু উল্লিখিত পদ্ধতিতে ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষ করে।

ঘ. লাবু মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শে সমন্বিতভাবে ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষ করে।
ধানক্ষেতে গলদা চিংড়ি চাষ বলতে একই জায়গায় একই ব্যবস্থাপনায় একই সময়ে ধান ও চিংড়ি চাষ করাকে বোঝায়। ধানক্ষেতে চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে ধান হলো মুখ্য ফসল আর চিংড়ি হলে দ্বিতীয় ফসল। একই জমিতে ধানের সাথে চিংড়ি চাষ করলে ধানের তেমন ক্ষতি হয় না, পাশাপাশি চিংড়ি বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করা যায়।
সমন্বিত চাষ পদ্ধতিতে ধান ক্ষেতে চিংড়ি চাষ করলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। কেননা, একই জমিতে একাধিক ফসল ফলানো যায়। ধান ক্ষেতে চিংড়ি চাষ করলে এর জন্য আলাদা জায়গার দরকার হয় না। চিংড়ির মল ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ ধান ক্ষেতে সার হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও ধানের জন্যে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গগুলোকে চিংড়ি খেয়ে ফেলে। ফলে ধান চাষের উৎপাদন ব্যয়ও অনেকাংশে কমে যায়। সমন্বিত চাষে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না বলে পরিবেশ, মাটি ও পানি বিষাক্ততা থেকে রক্ষা পায়। চিংড়িকে সম্পূরক খাবার না দিয়েও ভালো ফলন পাওয়া যায়। এই ধরনের সমন্বিত চাষে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়, আগাছা নিয়ন্ত্রণ হয়, ইঁদুরের উপদ্রব হতে পারে না। এতে স্বল্প সময়ে অধিক উৎপাদন হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদন দ্বারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।
অর্থাৎ, লাবু মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শে সমন্বিতভাবে ধানের ক্ষেতে গলদা চিংড়ি চাষ করে অল্প ব্যয়ে, স্বল্প সময়ে অধিক আয় করে। তাই বলা যায়, সমন্বিত চাষ পদ্ধতিটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

মাৎস্য চাষ এর সৃজনশীল

সৃজনশীল প্রশ্ন ৪ : আমাদের অর্থনীতিতে জাতীয় মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রচুর পরিমাণে এই মাছ আহরণ করা হয়। তাই সারা বছরের চাহিদা মেটানোর জন্য একে এক বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যেখানে মাছের প্রোটিনের কিছু পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু অনেক সময় এই পদ্ধতিতে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

ক. প্লিওপডস কী?
খ. চিংড়ি চাষে পানির কী কী গুণ থাকা উচিত? ব্যাখ্যা করো।
গ. উল্লিখিত মাছ সংরক্ষণে উদ্দীপকে বর্ণিত পদ্ধতিটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উল্লিখিত পদ্ধতিতে মাছ সংরক্ষণে সৃষ্ট সমস্যা বিশ্লেষণ করো।

৪ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. চিংড়ির বক্ষ উপাঙ্গের শেষ ৫ জোড়া উপাঙ্গকে চলন পদ বা প্লিওপডস বলে।

খ. চিংড়ি চাষের জন্য ঘোলা, ভারি, কাদাযুক্ত পানি অনুপযোগী। চিংড়ি যাতে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে সেজন্য পানিতে যথেষ্ট পরিমাণে অণুজীব থাকা বাঞ্ছনীয়। পানির স্বচ্ছতা ২৫-৩৫ সেমি, pH ৭-৮.৫ এবং সর্বোত্তম তাপমাত্রা ২৮°-৩১° সে. হলে ভালো হয়। পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বাগদার জন্য ১০-২৫ পিপিটি এবং গলদার জন্য ০-৪ পিপিটি থাকা প্রয়োজন।

গ. উদ্দীপকে ইলিশ মাছ সংরক্ষণে শুষ্ক লবণায়ন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।
শুষ্ক লবণায়ন পদ্ধতিতে ইলিশ মাছ সংরক্ষণে আঁইশ ও পাখনা দেহ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর বুক চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে নেওয়া হয় এবং আড়াআড়িভাবে মাছটির বুকের দিক থেকে পিঠ পর্যন্ত কয়েকটি টুকরায় ভাগ করা হয়। গুদামজাতকরণের সুবিধার জন্য অনেক সময় ঘাড়ের কাছ থেকে একটি ছোট টুকরা কেটে বাদ দেওয়া হয় যাতে মাছটি সহজেই বাঁকানো যায় । কাটা মাছের দেহের বাইরে ও অভ্যন্তরে ভালোভাবে লবণ মাখিয়ে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে লবণ ও মাছের অনুপাত থাকে ১ : ৪। ঝুড়ির তলায় লবণের আস্তরণ দিয়ে লবণায়িত মাছকে রেখে তার উপর আরেকবার লবণের স্তর দিয়ে মাছকে ঝুড়িতে সাজানো হয়। এরপর খড়ের তৈরি মাদুর দ্বারা ঝুড়িটিকে ঢেকে সাধারণ তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা হয়। এভাবে ৭-১০ দিনে মাছে রাইপেনিং হয়। এরপর লবণজাত মাছ টিনের পারে গুদামজাত করা হয়। পরিশেষে বলা যায়, লবণায়ন মাছ সংরক্ষণের একটি প্রক্রিয়া যা মাছে খাবার লবণ প্রয়োগের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে মাছ এক বছর পর্যন্ত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যায়।

ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত পদ্ধতিটি হলো লবণায়নের মাধ্যমে মাছ সংরক্ষণ।
লবণজাতকরণ মাছ সংরক্ষণের একটি প্রক্রিয়া যা মাছে খাবার লবণের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে ইলিশ মাছ লবণায়নের সময় যে সকল সমস্যার সৃষ্টি হয় তা হলো-
১. লবণায়িত করার সময় মাছ ও লবণের সঠিক অনুপাত মেনে চলা হয় না, ফলে মাছের গুণাগুণ ঠিক থাকে না।
২. অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না, এমনকি মাছকে খণ্ড খণ্ড করে কাটার পর সেগুলোকে ধোয়া হয় না।
৩. মাছকে খণ্ড খণ্ড করে কাটার সময় অণুজীব দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।
৪. অনেক সময় অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা হয়, এতে প্রোটিনের জৈবিক মান নষ্ট হয়।
৫. অধিকাংশ সময়ই অবিশুদ্ধ লবণ ব্যবহৃত হয় যা মাছের আকর্ষণীয় রং, গঠন ও গন্ধ সৃষ্টিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
৬. মুক্ত বাক্সে লবণজাতকৃত মাছের চর্বির জারণ ঘটে যা মাছের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে।
৭. লবণজাতকরণের সময় পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাছের মাংস থেকে তেল জাতীয় পদার্থ বের হয়ে সমস্ত দ্রব্যের উপর ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থাৎ লবণজাত করে মাছ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উল্লিখিত সমস্যাগুলো দেখা যায় যে কারণে অনেক সময় ইলিশ মাছ পচে নষ্ট হয়ে যায়।

মাৎস্য চাষ এর সৃজনশীল

সৃজনশীল প্রশ্ন ৫ : সজীব একজন মৎস্য চাষি। তিনি গভীর সমুদ্র হতে মাছ সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। বিক্রির পূর্বে তিনি ছোট ও বড় মাছ গ্রেডিং করে পরিবহনের সময় বায়ুনিরোধক বাক্সে সংরক্ষণ করেন। এ পদ্ধতিতে সজীব উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি কিছু অসুবিধারও সম্মুখীন হন।

ক. সুষম সম্পূরক খাদ্য কাকে বলে?
খ. পুকুরে চুন প্রয়োগ করা হয় কেন?
গ. সজীবের মাছ সংরক্ষণ পদ্ধতিটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. সজীবের গৃহীত সংরক্ষণ পদ্ধতিটির সুবিধা-অসুবিধা বিশ্লেষণ করো।

৫ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. যে সম্পূরক খাবারে সকল পুষ্টি উপাদান (যেমন— আমিষ, শর্করা, স্নেহ, খনিজ লবণ, ভিটামিন) যথাযথ মাত্রায় রেখে তৈরি করা হয় তাকে সুষম সম্পূরক খাদ্য বলে।

খ. পুকুরে প্রয়োগকৃত বিভিন্ন সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য চুন প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ।
চুন মাটি ও পানির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। পানির পিএইচ মানের ভারসাম্য বজায় রাখে। পানিতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়ায়।
পানির ঘোলাত্ব কমায় ও পানি পরিষ্কার রাখে। মাছের রোগজীবাণু, ও পরজীবী ধ্বংস করে। এ সমস্ত কারণে পুকুরে চুন প্রয়োগ করতে হয়। সজীব গভীর সমুদ্র হতে মাছ সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রির পূর্বে পরিবহনের সময় বরফজাতকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেন।
বরফজাতকরণ পদ্ধতিতে প্রথমে মাছকে সাধারণ পানিতে ধুয়ে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে মাছের আঁইশ কিংবা নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়। না। অতঃপর টুকরি বা ঝুড়ি অর্থাৎ যে পাত্রে মাছ রাখা হবে সেটি পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিয়ে ঝুড়ির ভেতরের চারদিকে চটের একটি আস্তরণ দেওয়া হয়। টুকরি বা ঝুড়ির তলায় ১.৫-২ ই পুরু করে টুকরা করা বরফের স্তর দেওয়া হয়। এরপর একস্তর মাছের উপর একস্তুর বরফ রেখে স্তরে স্তরে বরফ ও মাছ সাজিয়ে ঝুড়িটি ভর্তি করা হয়। এভাবে মাছের সর্বশেষ স্তরের উপরে একস্তর বরফ দিয়ে তার উপরে একটি চটের টুকরা দিয়ে ঢেকে সেলাই করে দেওয়া হয়। বরফের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ক্লোরোটেট্রাসাইক্লিন বা অক্সিটেট্রাসাইক্লিন নামক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা যেতে পারে। বরফ ও মাছের অনুপাত মাছের ওজন ও ঋতুর ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় বরফ ও মাছের অনুপাত গ্রীষ্মকালে ২ : ১ এবং শীতকালে ১৫১ রাখা হয়।
সঠিক পরিচর্যা, বরফ ও মাছের সঠিক অনুপাত এবং সঠিক পাত্র ব্যবহার করা হলে এ পদ্ধতিতে মাছ ও চিংড়িকে ৭-১০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

ঘ. সজীব বরফজাতকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে মাছ সংরক্ষণ করে পরিবহন করেন।
বরফ দিয়ে মাছ পরিবহনের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণে মাছ টাটকা থাকে। সংরক্ষণ পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে সহজ। ছোট-বড় সব ধরনের মাছ এই পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়। বরফ তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও সম্ভা তাই খরচ কম হয়। বরফ দিয়ে সংরক্ষিত মাছ সহজে পরিবহন করা যায়। বরফ গলা পানি মাছের দেহে বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়া, রক্ত ও ময়লা ধুয়ে সরিয়ে ফেলে।
বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণের কিছু অসুবিধাও রয়েছে, যেমন- বরফ টুকরার (বিভিন্ন আকারের) আঘাতে মাছের দেহে ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। তাপ কুপরিবাহী পাত্র ব্যবহার করা হয় না বলে বরফের কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বরফ তৈরির পানি অপরিষ্কার হলে মাছের দেহে রোগ জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে। তাছাড়া বরফ সংরক্ষণের ব্যবহৃত পাত্র সঠিকভাবে ধোয়া ও জীবাণুমুক্ত না হলে মাছে জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। বরফ ও মাছের অনুপাত সঠিক না হলে মাছের গুণাগুণ নষ্ট হয়।
সুতরাং, বরফজাতকরণ পদ্ধতিতে সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও এ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত মাছ ৩-৪ দিন টাটকা থাকে এবং এর গুণাগুণও থাকে টাটকা মাছের মতো। তাই বরফজাতকরণ মাছ সংরক্ষণের একটি নিরাপদ ও উত্তম পদ্ধতি।

About admin

Check Also

আহ্বান

(সাহিত্যপাঠ) এইচএসসি: আহ্বান গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর

আহ্বান হচ্ছে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর অর্থাৎ এইচএসসি’র সাহিত্যপাঠের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প। আহ্বান গল্প থেকে বাছাইকৃত সেরা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *